Hooligan on Hill Track-পাহাড়ের পথে-৩

Team at Jatrabari Flyover

(Hooligan on Hill Track-পাহাড়ের পথে-২) এরপর…২৩ অক্টোবর ২০১৪ ঢাকা: হ্যাঁ এই সেই ২৩ অক্টোবর..যা মনের খুব গভীরে গেঁথে গেছে..যতবার বাকী আটজনকে মনে করিযে দিয়েছি ততবারই সবাই স্মৃতিকাতর হয়ে গেছে.. মোটামুটি সবারই এর আগে পরে অনেক ট্যুর হয়েছে.. কিন্তু এই ট্যুরটা সবারই জন্য অন্যরকম একটা ট্যুর ছিল..যাহোক সেই সময়ে আবার ফিরে যাই..

ট্যুরের আগে কেমন ঘুম হয় তা মনে হয় অনেকেরই জানা আছে। আমি ঘুমিয়েছি ঠিকই.. তবে ঘুমিয়েছি সেই পাহাড়েই..আর ঠিক সোয়া চারটায় পাহাড় থেকে ঢাকা বনশ্রীতে ফিরেছি  😀

ঘুম থেকে উঠতেই জুন ভাই ফোন দিলো..তারপর আমিও টয়লেট সেরে ওয়াসিফকে কল দিলাম.. উনিও মনে হয় মাত্র পাহাড় থেকে ফিরলেন। ঝটপট রেডি হয়ে নামতে বললেন।

আমি দুটো বিস্কুট আর পানি মুখে দিয়ে আমার ভাইকে ডেকে তুলে দরডজা লাগিয়ে দিতে বললাম। ও ফোন করে গার্ডকে মেইন গেট খুলে দিতে বললো। আমাকে সাবধানে যেতে বললো, ব্রেকের সময় ফোনে আপডেট দিতে বললো।

আমি নিচে নেমে এসে বাইক বের করলাম। জহির ভাই আর সাঈদ ভাইও এসে গেছে। ওয়াসিফ ও নামলো। যার যার ব্যাকপ্যাক কষে বাইকের সাথে বেধে নিলাম।

Saleh & Wasif at Jatrabari Flyover

কোনখানে গেলে কেন যেন আমাকে সব জায়গায় কিছুটা হলেও হাত লাগাতে হয়। এবারও ব্যাতিক্রম নয়। ওদের লাগেজ সেট করা থেকে এবারের মতো আমার হাত লাগানো শুরু হলো..বাকিটা সময়ে সময়ে আরো জানবেন। ব্যাস পাঁচটা দশে আমরা যার যার বাইক স্টার্ট দিলাম.. উপরে জানালায় দাড়িয়ে থাকা ভাইকে হাত নেড়ে দিলাম.. হাহ্ হা আমাদের ট্যুর শুরু.. I m quite sure u can feel the excitement.. 🙂

শেষ রাতের ঢাকা আসলেই অন্য রকম..হলুদাভ কমলা..আলোয় রাস্তা মোটামুটি আলোকিত…ওয়াসিফ, জহির ভাই আর সাঈদ ভাই বাইক টানা শুরু করলো.. আমি ফলোয়ার… আমার বাঁহাতে সেট করা একশন ক্যাম অন করে দিলাম.. আমি ক্যাম অন করে ওদের পিছে পিছে ছুটলাম..সেইরকম এক রোমাঞ্চ..

কিছুদুর যেয়ে জহির ভাই ছুটে গেল শর্টকাট এ..আমরা তিনজন সরাসরি দড়িছেঁড়া গরুর মতো ছুটলাম যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের দিকে.. ফ্লাইওভার থেকে নেমে টোল দিয়ে শেষ মাথায় দেখি জুনভাই, জহির ভাই আর আরো দুজন। আমি বাইক পার্ক করে স্বভাবসুলভ একটু সরে দাড়ালাম।

একটুপর জুনভাই এগিয়ে এসে সবার সাথে পরিচয় করে দিলেন। দুজনকেই আমি অনলাইনে চিনি.. রিমন আর এ্যাডভোকেট মাশুক ভাইকে.. এবার অন্যরকম আগ্রহে আমাদের কুশলাদি বিনিময় হলো..সবসময় আনলাইনে যোগাযোগ হয় এবার স্বশরীরে.. আসলেই অন্যরকম এক অনুভুতি বিশেষ করে দুরে থাকা আমার জন্যে।

Team at Meyor Hanif Flyover

মাশুক ভাই ঘুরে ফিরে আমাকে বলছিলেন যে তিনি মনে করেছিলেন আমি হয়তো আসবো না.. কিছুটা কথা কাটাকাটির কারনে আর ‍বিশেষ করে দুরের মানুষ কেবল আমিই…আমি হেসে ফেললাম.. বললাম যে না গেলে অন্তত আপনাদের গতদিনের মিটিংয়ে চা খেতে আসতাম..চা খেয়ে আবার ফেরত যেতাম… 🙂

এরই মধ্যে আর একজন চলে আসলেন…পুরোপুরি রাইডিং জ্যাকেট আর গিয়ার পড়ে.. হ্যাঁ উনি আমাদের মারুফ ভাই। সিম্পলি পরিচয় হলো..কথা তেমন হলোনা কারন কেউই কেউকে কোনভাবেই চিনতামনা.. তবে উনি বললেন আপনিই কি রংপুর থেকে এসেছেন? আমি হ্যাঁ বললাম..এটুকুই.. হাহ্ তখন কি আমরা জানতাম আমাদের পরবর্তি পথ কতবার কতভাবে কাটাকাটি খেলবে… আলহামদুলিল্লাহ্…

সবাই মোটামুটি পরিচয় পর্ব শেষ..এবার শুরু করার জন্যে প্রস্তুত..কিন্তু জুনভাই বললেন আর একজন আসবে.. এদিকে আকাশ পরিস্কার হয়ে আসছে…ভোর হয়ে আসছে..সবাই মোটামুটি বিরক্ত…যে আসবে সে এতো লেট কেন…রংপুরের লোক এসে বসে আছে আর ঢাকার লোকের দেখা নাই.. 😛

Team waiting for last one

জুন ভাই জানালেন যিনি আসবেন তিনি এই ট্যুরের জন্যেই বাইক বাজাজ ডিস্কোভার বাইক বিক্রি করে মাত্র কয়েকদিন আগে ইয়ামাহা এফজেডএস বাইক কিনেছে। কারন জুনভাই এর শর্ত ছিলো এই ট্যুরে যেতে হলে রাইডারকে ১৫০সিসি আর টিউবলেস টায়ারের বাইক নিতে হবে। উনি পাহাড়ে এই প্রথমবারের বড় ট্যুরে কোন রিস্ক নেবেননা…

যাক শেষ পর‌্যন্ত উনি আসলেন… উনি ছিলেন ওবায়দুল হক রনি ভাই.. এসই সবার সাথে পরিচয় হলো.. তারপর পরই খোজ করলেন কে সেই লোক রংপুর থেকে এসেছে…জুন ভাই দেখিয়ে দিলেন.. উনি হাসতে হাসতে আমার দিকে এগিয়ে এলেন…কিছুটা অপ্রস্তুত..আমি এই ভঙ্গির সাথে খুবই পরিচিত..কেননা অনলাইনে পরিচিত সবাই প্রথমবার দেখায় আমার হালকা পাতলা চেহাড়ায় একটু অবাক হয়.. আমিই সেই মফিজ কিনা…হাহ হাহ হা…

এদিকে ভোর হয়ে গেছে.. আমরা বাইক স্টার্ট দিয়ে লাইন হয়ে গেলাম কিছুটা..সামনে জুন ভাই, রিমন, মারুফ ভাই, মাশুক ভাই, সাঈদ ভাই, আমি, তারপর জহির ভাই আর শেষে ওয়াসিফ.. শুরু হলো মোটামুটি গতিতে টানা…সকাল হয়ে যাওয়ায় একটু দেরি হলো..রাস্তায় গাড়ি বেড়ে যাচ্ছে…তাড়াতাড়ি ঢাকা থেকে বের হতে হবে ভিড় বাড়ার আগেই..

মোটামুটি ভালোভাবে আমরা ঢাকা থেকে বের হলাম.. তারপর শুরু হলো একভাবে টানা… ওহ এখনো সেই কুয়াশা ভেজা সকালের কথা মনে আছে আমরা সমানে বাইক টানছি..তেবে সিরিয়াল ঠিক রেখে…সবাই ৯০-১১০ গতিতে… মাশুক ভাই এই ট্যুরের জন্যে ওনার বন্ধুর সাদা ইয়ামাহা ফেজার নিয়ে এসেছেন…উনি সেই মজায় বাইক ছোটাচ্ছেন…অবশ্য বাইকটার মায়ায় পরব্তীতে উনি বাইকটা কিনে নেন বন্ধুর কাছ থেকে…

Team at Xpeed CNG Station, Daudkandi

আমরা বেদম ছুট দিয়ে দাউদকান্দি ব্রীজ পার হয়ে বামে এক পেট্রল পাম্প Xpeed CNG Station এ থামলাম..তেল নেয়া হবে…বাইক চেক হবে..। আমি তেল নিয়ে একে এক বাইকের চাকার প্রেসার আর চেইন চেক করলাম… তারপর চলল চা-কেক, বিড়ি আর জল-বিয়োগ..ফাঁকে ফাঁকে ক্যামেরায় ক্লিক… চা-নাস্তা সেরে আমরা আবার সাতটায় রাস্তায় নামলাম।

এবার সবাই বেদম ছুট…ঢাকা চিটাগাং হাইওয়ে..প্রচুর বদনাম আছে এর..বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যস্ত হাইওয়ে। রাতের আধারে চার-পাঁচ বছর আগে এই রাস্তায় বাস জার্নি হয়েছিল..তেমন কিছু না দেখলেও টের পেয়েছিলাম কতটা সরু আর বিজি রোড এটা। এবার বাইক নিয়ে এই পথে নেমে বুঝলাম কেন এতো বদনাম এর।

তবে আমার জন্যে সমস্যা না..কারন আমি এমন এক এলাকার লোক যেখানে কেবল বিচিত্র পদের যানবাহনই নয় বরং হুটহাট গরু-ছাগল থেকে শুরু করে মানুষ পর্যন্ত হঠাৎ এসে রাস্তায় লুঙ্গি খেচে…হাহ্ হাহ্ হা.. আর এই চিটাগাং রোডের সারি দিয়ে হাই-স্পিডে চলা বড় বড় যান বাহন তো পান্তা ভাত…তবে রাস্তা চরম খারাপ..

রাস্তা চার লেন করার জন্যে ডান দিকে কাজ শুরু হয়েছে। আর এই দিকের রাস্তায় চরম ঢেউ..পিচ গলে উঁচু হয়ে জমে দুটো স্পিড ব্রেকারের মতো উঁচু হয়ে গেছে কোথাও.. আবার কোথাও লেন করে ট্রাকের চাকার মাপে দুপাশে নিচু আর মাঝখানে উঁচু..পুরো পথজুড়ে এই অবস্থা…

তাই যানবাহন ওভারটেক করতে যেয়ে একেকজনকে মোটামুটি রাস্তার উচুনিচুতে নৌকার মতো বাইকনিয়ে লাফালাফি করতে হচ্ছে। আর এককটা বাইক ৯০-১১০গতিতে এরকম ওভারটেকিং এ প্রতিটা সেকেন্ড এলার্ট থাকতে হচ্ছে… তবে বিষয়টা সবারই নিয়ন্ত্রনের মধ্যেই.. আর আমরা এই নাচানাচি উপভোগই করছিলাম..

তবে এই হাইস্পিডে নাচানাচি রাইডে মাশুকভাই আর জহির ভাই দুদুবার সামনের ট্রাকের চাপ খেতে খেতে বেচে গেছে..আর ওয়াসিফ তো আরেক ডিগ্রি সরেস..ট্রাক ওভারটেক করার সময় ট্রাকের ঘুরন্ত চাকায় হাত ছুয়ে দিচ্ছিল.. আর জুন ভাই সামনের দিকে সাদা-নীল এফজেড নিয়ে এঁকেবেকে ট্রাক পার করছিলেন..মাঝে মাঝে পিছনে এসে যারা ওভারটেক করতে দেরী করছিল তাদের পথ করে দিচ্ছিল..এভাবে সবাইকে গাইড করে পুরো রাস্তা উনি লিড দিয়ে নিয়ে গেলেন..

Team at Comilla Highway Inn

সকাল সাড়ে আটটায় আমরা কুমিল্লার এক হোটেলে থামলাম সকালের নাস্তা করার জন্যে। জুন ভাইয়ের স্ট্রাটেজীটা ভালো..চালানোর সময় ভালোভাবে টানাবেন আর প্রতি ৫০কিমিতে একটা ব্রেক দেবেন..যেকোন ধরনের রাইডারের জন্যে সয়ে নেবার জন্যে ভালো…

আমরা ভালো করে ডিম-পরোটা-সবজি দিয়ে নাস্তা-চা সেরে বাইরে এলাম..বিড়ি ধরিয়ে সবার টুকটাক গল্প শুরু হলো নৌকা-বাইচের রাস্তায় রাইড নিয়ে…এরপর ফেনী পার হয়ে আমরা বামে বরোইয়ার হাটের রাস্তায় ঢুকবো…এখানে গল্পে গল্পেই আমাদের মধ্যের অদৃশ্য জড়তাটুকু দুর হয়ে গেল…হাহ্ এটাই রাইডের মজা…বছরের পর বছরের দুরত্ব এক রাউডেই শেষ হয়ে যায়..

আমরা আবার বাইক স্টার্ট দিলাম..আবার সেই টান…কুমিল্লা আর তারপরের কয়েকটা জায়গায় নতুন করে ব্রীজ আর কালভার্ট বানানো হচ্ছে..সেখানে চরম জ্যামের মধ্যে আমরা একেবেকে নয়টা বাইক বের হয়ে আসলাম..সে কে দেখার মতোই দৃশ্য..রাস্তার দুপাশের লোকজন অবাক হয়ে দেখে আমাদের…

Team at Baraiyarhat

ভিড়ভাড় গুলো ঠেলে আমরা আবারো বাইক টানতে লাগলাম…তবে কুমিল্লা চৌদ্দগ্রাম থেকে ফেনী পর্যন্ত কয়েকজন কেমন যেন সিরিয়ালের বাইরে চলে গেল…জুন ভাই আর কোন ব্রেক দেয়নি…কেবল টেনে গেছে..তাতে কয়েকজন বিরক্ত হয়ে গেছে…কেউ বাইক স্লো করে ফেলেছে আর কেউ বাইক থামিয়ে জল-বিয়েগ আর বিড়ি ধরিয়েছে…

সিরিয়ালের শেষের দিকে থাকায় আমি এক এক করে সামনের দিকে চলে গেলাম..কারন জুনভাই ইশারায় টানতে বলে দিলেন…মোটামুটি সবাই কিছুদুর পরপর থেমে গেছে অন্যদের দেখে.. আমি বাইক স্লো করে চালাতে চালাতে সামনের রিমনকে পেয়ে গেলাম রাস্তার পাশে দাড়ানো…সামনে আর কেউ নেই..তাই আমিও থেমে পড়লাম…অপেক্ষা করতে করতে বিরক্ত হয়ে আমি আর রিমন আবার বাইক স্টার্ট দিলাম..এর মধ্যে জুনভাই চলে এসেছে…আমাদের টেনে যেতে বললো..চালাতে চালাতে বললো পেছনের ওদের বাইক স্টার্ট করিয়ে দেয় হয়েছে..ওয়াসিফ আর জহির ভাই ওদের গরু ঠেলা করে আনছে… 😀

ফেনী পার হতে হতে আবার আমরা এক সিরিয়ালে চলে আসলাম..সামনে বারোইয়ার হাটের মোড়..কিন্তু মেইনরোডে উঁচু আইল্যান্ড থাকার কারনে ঘুরপথে আমাদের বারোইয়ার হাটের সরু আঞ্চলিক পথে নেমে পড়তে হলো..বারোইয়ার হাটের পথ সম্পূর্ণ আলাদা..এখান থেকেই আমাদের জন্যে হাইওয়ে শেষ..আর পাহাড়ী এলাকা খাগড়াছড়ির দিকে চলা শুরু…

Team at Baraiyarhat

আমরা বারোইয়ার হাটের রোডে উঠে বাঁদিকে পোষ্ট অফিসের উল্টোদিকে চায়ের দোকানে থামলাম…গলা সবার শুকিয়ে গেছে..চললো পানি গেলা… আমি তো সারা রাস্তা আমার পিঠে ঝোলানো প্যাক থেকে পানি খেয়েছি…তাই হাইড্রেশন প্যাকটাকেই পানি খাওয়ালাম টইটম্বুর করে..চললো চা আর বিড়ি.. আর সেই সাথে তুমুল গল্প… আহ্ আজো আমি ছবিগুলো দেখি আর সেই অসাধারন মুহূর্তগুলো আমার কাছে একদম জীবন্ত হয়ে ওঠে …আমরা নয় ভবঘুরে পাহাড়ের পথে…আবার হয়তো এই নয়জন কোন একদিন এভাবে নেমে পড়বো…অন্তত আর একবার…

চলবে… (Hooligan on Hill Track-পাহাড়ের পথে-৪)

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s